
মুহা. ফখরুদ্দীন ইমন, চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বসতবাড়ির মাত্র ১০ শতক জায়গা ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চরমে। হামলা-মামলায় জর্জরিত হয়ে তিনটি পরিবার আজ নিঃস্ব প্রায়। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের এ ঘটনায় বড় ভাইয়ের দায়েরকৃত মামলায় জেল খাটছেন আপন ছোট ভাই। মারামারির ঘটনায় না থেকেও হয়েছেন মামলার অন্যতম আসামী। কয়েকদিন জেল খাটার পর এক ভাই জামিনে মুক্তি পেলেও এখনো চরম উৎকন্ঠায় দিনাতিপাত করছেন তিনি। সিএনজি চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করা পরিবারটি ভয়, আতঙ্ক আর লজ্জ্বায় সমাজে চোখ দেখাতে পারছেন না এখন। ঘটনার সাথে জড়িত না থেকেও মামলার আসামী হয়ে সমাধানের আশায় ঘুরছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। আইনী সহায়তা চেয়েও পাননি সাড়া। সামাজিকভাবে কয়েকদফা মীমাংশার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকালে সরেজমিন ঘুরে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিতের পাশাপাশি বেরিয়ে এসেছে চমক জাগানো কিছু তথ্য।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বসতবাড়ির জমি সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধের জেরে গত ১৩ মার্চ উপজেলার ঘোলপাশা ইউনিয়নের জুগিরখিল গ্রামের মৃত আলী নোয়াবের বড় ছেলে আলমগীর হোসেন এবং ছোট ছেলে নজরুল ইসলাম শামীমের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে আলমগীরের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কাটা সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত জখম হয়। এ ঘটনায় শামীমের শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলা-ফুলা জখম সহ সেও গুরুতর হয়। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে আলমগীর হোসেন বাড়িতে এসে গত ৮ এপ্রিল তার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর এবং শামীম সহ তাদের স্ত্রীদের নামে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থানা পুলিশ ঐদিন রাতেই অভিযান চালিয়ে জাহাঙ্গীর এবং শামীমকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করে। আদালত থেকে জামিন নিয়ে বর্তমানে বাড়িতে অবস্থান করছেন জাহাঙ্গীর। অপরদিকে একই মামলায় শামীম এখনো জেলে রয়েছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমার বড় ভাই আলমগীর এবং ছোট ভাই শামীম গত ১৩ মার্চ জমি (বসতবাড়ির রাস্তা) সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মারামারি করে। এ ঘটনায় দুইজনেই আহত হয়। পরে স্থানীয়রা দুইজনকেই হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঐদিন আমি বাড়িতেই ছিলাম না। অথচ এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় আমাকে সহ আমার স্ত্রীকেও আসামী করা হয়েছে। উক্ত মামলায় আমি ইতিমধ্যে জেলও খেটেছি। আমি প্রশাসনের মাধ্যমে এ ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে সঠিক বিচার এবং সুষ্ঠু সমাধান চাই।
এ ব্যাপারে আলমগীরের মাতা নূরজাহান বেগম বলেন, আমার বড় ছেলে আলমগীর বেশ উৎশৃঙ্খল। তার স্ত্রী হাসিনার উসকানিতে সে আমার অন্য ছেলেদের সাথে ঝামেলা করে সবসময়। আমার ব্যবহার করা বাথরুমটি সে তার স্ত্রীর কথায় তালাবদ্ধ করে রেখেছে। আমার সংসারের সকল জিনিসপত্র সে জোরপূর্ববক নিয়ে যায় এবং সকল কিছুই সে একা ভোগ করছে। তুচ্ছ ঘটনায় সে কয়েকবার আমার ছোট ছেলেদেরকে মারধর করেছে। ঐদিনের ঘটনার তিনদিন পর আমি বাড়িতে এসেছি। এসে আমি আমার কানের দুল বন্ধক রেখে বড় ছেলেকে দেখতে হাসপাতালে যাই। আমি তাকে ৩৫ হাজার টাকা দিতে চাইলে সে নেয়নি। আমি চাই, আমার তিন ছেলে যাতে মিলেমিশে সুন্দরভাবে একই বাড়িতে বসবাস করতে পারে। সামাজিকভাবে মীমাংশার জন্য আমি সমাজের লোকজনকে বলেছি। তারা বলেছে, শীঘ্রই বিষয়টি নিয়ে সামাজিকভাবে বসবে।
এ বিষয়ে আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমার ভাইয়েরা মিলে আমাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে। দীর্ঘদিন যাবৎ আমি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। আমার পেটে-বুকে এখনো অন্তত ৩০টি সেলাই রয়েছে। আমার ডান হাতে তিনবার অপারেশন করা হয়েছে। জানিনা কবে সুস্থ হবো। এ ঘটনায় আমার স্ত্রী বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে। অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়েছিল। বর্তমানে একজন জামিনে আছে। আমি ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক বিচার চাই।
এ বিষয়ে ঘোলপাশা ইউনিয়নের সামাজিক ব্যক্তিত্ব মাস্টার কাজী আব্দুল কাদের, রিয়াজ উদ্দিন মেম্বার, আইয়ুব আলী, মফিজ উদ্দিন সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ জানান, আমরা সামাজিকভাবে বহুবার বিষয়টি মীমাংশার চেষ্টা করেছি। তাদের অসহযোগিতা এবং সামাজিক বিচার না মানায় শেষ পর্যন্ত মীমাংশা করা সম্ভব হয়নি। এরপরে তাদের মধ্যে একটি মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হওয়ার পর আলমগীরের ছোট দুই ভাই গ্রেফতার হয়ে জেল খাটছে। সমস্যাটির সমাধান হওয়া দরকার।
মামলার স্বাক্ষী ছুট্টু বলেন, ঘটনার সময় আমি নামাজে ছিলাম। পরে এসে দেখি আলমগীর ভাইকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিচ্ছে স্থানীয়রা।
চৌদ্দগ্রাম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তারেক উদ্দিন আকাশ বলেন, ভুক্তভোগির পরিবার কর্তৃক থানায় মামলা দায়েরের পর দুইজন আসামীকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছি। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।