
গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
শরীকানা বা ভাগে কোরবানী করা সর্বস্বীকৃত একটি বিষয়। যে বিষয়ে ছিল না কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব, ছিল না কোন সন্দেহের অবকাশ। সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। অপপ্রচার করা হচ্ছে শরিকানা বা ভাগে কোরবানী করা শরীয়ত সম্মত নয়। কিছু জ্ঞানপাপী ব্যক্তি সরল প্রাণ মুসলমানদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। সন্দেহের কালো ছায়ায় মুসলিম উম্মাহকে ছেয়ে দেয়ার অপচেষ্টাই মেতে উঠেছে। কোরবানী আত্মত্যাগ, আনুগত্য,ভালবাসা প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। তাই তো সচ্ছল অসচ্ছল সবাই একক বা ভাগে কোরবানীর মাধ্যমে ত্যাগ, ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে চায়। তাই আসুন আমরা জেনে নেই, তাদের কথার সত্যতা কতটুকু। এ বিষয়ে সুন্নাহর আলোকে দিক নির্দেশনা কি? শরিকানা বা ভাগে কোরবানী করার বিধান কি:-
শরীকানা বা ভাগে কোরবানী কি জায়েয?
হ্যাঁ।শরীকানা বা ভাগে কোরবানী করা জায়েয এবং শরীয়ত সম্মত। সামর্থ্যবান,অসামর্থ্যবান সবার জন্য শরীকানা বা ভাগে কোরবানী দেয়া শরীয়ত সম্মত। তবে সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষে একা কোরবানি করা বিভিন্ন কারণে উত্তম। তবে শরিকে/ভাগে কোরবানীর বিধান উম্মতকে দিয়েছে অবকাশ ও প্রশস্ততা। এই প্রশস্ততা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহয় স্পষ্টভাবে আছে।
যেমন হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত। জাবের বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা হুদায়বিয়ার সনে উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং গরুও সাত জনের পক্ষ থেকে কোরবানী করেছিলাম। (সহীই মুসলিম হা- ২৩২২, আবুদাউদ হা- ২৮০৯, তিরমিযী হা- ১৪২২, ইবনু মাজাহ হা- ৩১৩২)।
হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে এক বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি বলেন: আর ইউসুফ ইবনে আবি ইউসুফ আমাদের কাছে তাঁর পিতা, আবু হানিফা, হাম্মাদ, ইব্রাহিম এবং ইবনে মাসউদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “সাতজন লোকের কোরবানির জন্য একটি গরুই যথেষ্ট, আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন।” (আল-আছার, আবু ইউসুফ, পৃষ্ঠা ৬২)।
হযরত আবু ইউসূফ র. ইমাম আবু হানীফার সূত্রে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউস রাযি. এর বক্তব্য বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, কোরবানীর ক্ষেত্রে একটি গরু সাতজন ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট। [সূত্রঃ কিতাবুল আসার, পৃ. ৬২, হাদীস ৩০৮]। এই আসারে মুকিম নাকী মুসাফির পার্থক্য না করেই সাতজন শরীক হবার কথা এসেছে।
একটি গরুতে সাত শরিক হয়ে কোরবানী করা হাদিসে প্রমাণিত আছে।
সুতরাং আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে উট ও গবাদি পশু ভাগ করে নেওয়ার আদেশ দিলেন, প্রত্যেকটিতে আমাদের সাতজন করে।
হযরত জাবের রাঃ বলেন আমরা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সাথে সফরে ছিলাম। যখন কোরবানীর সময় এল, তখন রাসুলুল্লাহ সাঃ আমাদের কে আদেশ করলেন যেন আমরা গরু ও উটে শরিকে কোরবানী করি। আমরা একটি গরু ও উটে সাত জন করে শরিক হয়েছিলাম। সহিহ মুসিলম ৬/৪৭৪, হাদিস ২৩২৩, মুসনাদে আহমদ ২৮/১৫১, হাদিস ১৩৬০২।
অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (একটি) গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কোরবানি করা যায়)। (সুনানে আবু দাউদ ২/৩৮৮)।
উপরে উল্লেখিত হাদীস দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায় সুন্নাহর আলোকে শরিকানা বা ভাগে কোরবানী করা শরীয়ত সম্মত। এতে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেয় বরং তা হাদিস অস্বীকার করার অন্তর্ভুক্ত।
শরীকানা কোরবানীর বিধি-বিধান:-
১.মাসয়ালা: ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা এ তিন প্রকার পশু দ্বারা কেবল একজনের পক্ষ থেকে কোরবানী করা যায়। এ তিন প্রকার পশুতে শরীকী কোরবনী সহীহ হবেনা। (সহীহুল বুখারী ৫৫৫৩ হাদীস। ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০১ পৃষ্ঠা)।
২.মাসায়ালা: উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে, কারো কোরবানী সহীহ হবেনা। তবে সাতের কম জোড় বা বিজোড় যে কোন সংখ্যক যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় শরীক হতে পারবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৮ হাদীস। সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৩২ হাদীস।ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০০ পৃষ্ঠা। বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭ পৃষ্ঠা।
৩. মাসয়ালা: সাত ভাগে কোরবানী করলে সবার ভাগ সমান হতে হবে। কারো ভাগ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ কারো দেড় ভাগ এমন হলে কারো কোরবানী সহীহ হবেনা।
(খোলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৫ পৃষ্ঠা। আহসানুল ফতোয়া ৭/৫০৭ পৃষ্ঠা। বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭ পৃষ্ঠা।
৪. মাসয়ালা: শরীকী কোরবানী করলে, সকলের নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। অন্যথায় যদি কোন শরীকের নিয়ত গলদ থাকে, যেমন লোক দেখানো বা গোশত খাওয়া ইত্যাদি, তবে, কোরবানী সহীহ হবেনা। তাই শরীক নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত (সহীহুল বুখারী ৫৫৪৯ হাদীস। ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৯ পৃষ্ঠা। বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮ পৃষ্ঠা।
৫. মাসয়ালা: কোন শরীকের পূরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয়, অথবা কেউ হারাম উপার্জন দ্বারা শরীক হয়, তাহলে কারো কোরবানী সহীহ হবেনা। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৬/৩০৮ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া ৬/৪৮১ পৃষ্ঠা। কিফয়াতুল মুফতী ৮/২০৫ পৃষ্ঠা।
৬. মাসয়ালা: সুদখোর ও ঘুষখোরের সঙ্গে কোরবানী সহীহ হবেনা। তবে সে যদি হালাল টাকা দিয়ে শরীক হয়, তবে কোরবানী সহীহ হবে। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৬/৩০৮ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া ৬/৪৮১ পৃষ্ঠা। কিফয়াতুল মুফতী ৮/২০৫ পৃষ্ঠা।)
৭. মাসয়ালা: কোরবানীর পশু ক্রয় করার পুর্বেই অংশীদার নির্দিষ্ট করে নেয়া উচিত। তবে ধনী ব্যক্তি পশু ক্রয় করার পরও অংশীদার শরীক করতে পারবে। কিন্তু অনুত্তম হবে। আর গরীব ব্যক্তি অর্থাৎ তার উপর কোরবানী ওয়াজিব নয় সে পশু ক্রয় করার পর কাউকে শরীক করতে পারবে না। তবে পশু ক্রয়ের পূর্বে যদি শরীকের নিয়ত থাকে তাহলে। অংশীদার নিতে পারবে। (মুয়াত্তা মালিক ১০২৮ 11. আল-হিদায়া ৪/৩৭৭ পৃষ্ঠা।
৮. মাসয়ালা: কোরবানীর পশু জবেহ করার পর কাউকে অংশীদার শরীক করা জায়েয হবেনা। যদি করে তবে কারো কোরবানী সহীহ হবেনা। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ৪/৩০৯ পৃষ্ঠা। বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০ পৃষ্ঠা।
৯. মাসয়ালা: কোরবানীর পূর্বে কোন শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানীর অনুমতি দেয়, তবে জায়েয হবে। অন্যথায় ঐ শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে।তবে এক্ষেত্রে তার স্থলে অন্য কাউকেও শরীক করতে পারবে।(ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫১ পৃষ্ঠা। বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯ পৃষ্ঠা।
১০. মাসয়ালা: কোরবানীর পশুতে অন্য নিয়তে যারা শরীক হতে পারবে।
১। আকীকার নিয়তে।
২। মান্নত।
৩। হজ্বের কোরবানীর নিয়তে।
এছাড়া অন্য কোন নিয়তে কোরবানীর পশুতে শরীক হওয়া জায়েয হবেনা। (আহসানুল ফতোয়া ৭/৫৩৬ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৪৯৭ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে ইউনুছিয়া ২/৫৪৩ পৃষ্ঠা।
১১. মাসয়ালা: যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কোরবানি দেওয়ার নিয়তে কিনে আনে আর সে ধনী হয় তাহলে তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরিক করা জায়েজ হলেও শরিক না করে একা কোরবানি করাই শ্রেয়। শরিক করলে ওই অংশের টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম।
আর যদি ওই ব্যক্তি গরিব হয়, যার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়। তাহলে যেহেতু কোরবানির নিয়তে পশুটি ক্রয় করার মাধ্যমে লোকটি তার পুরোটাই আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তাই তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরীক করা জায়েজ নয়। যদি শরিক করে তবে ওই টাকা সদকা করে দেওয়া জরুরি। গরিব ব্যক্তি কোরবানির পশুতে কাউকে শরিক করতে চাইলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিতে হবে। (হেদায়া ৪/৪৪৩, কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১।
১২. মাসয়ালা: শরিকে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নেই। (আদ্দুররুল ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১)। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের কে সঠিক বিধি- বিধান জেনে এবং মেনে আমল করার তাওফিক দান করুন, আমিন।
লেখক : গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, সাংবাদিক, কলামিষ্ট, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান- গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, কুমিল্লা।