আয়শা রহমান প্রজ্ঞা: দেবীদ্বার প্রতিনিধি।।
২০১৯ সালের ১৪ মার্চ দেবীদ্বার অঞ্চলের মানুষের জন্য এক শোকের দিন। এদিন ইন্তেকাল করেন এলাকার আলোকিত মানুষ, সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আব্দুস সাত্তার মাস্টার। তাঁর প্রয়াণে শুধু একজন শিক্ষক নয়, হারিয়ে যায় দেবীদ্বারের এক চলমান ইতিহাসভান্ডার।
১৯৩৫ সালে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা মরহুম আলী আক্কাস মোল্লা ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সৎ চরিত্রের মানুষ। পারিবারিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার মধ্যেই সাত্তার মাস্টারের শৈশব গড়ে ওঠে। এলাহাবাদ পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে কুমিল্লা জেলা স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। তবে পারিবারিক প্রতিকূলতা ও পিতার অসুস্থতার কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে কিছু সময়ের জন্য বিরতি আসে।
জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। কখনও কৃষিকাজে মনোযোগ দিয়েছেন, কখনও জীবিকার তাগিদে ঢাকায় গিয়ে মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সীমিত সামর্থের মধ্যেও সততা ও মানবিকতার যে উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন, তা আজও স্মরণীয়।
১৯৬৩ সালে এলাহাবাদ জুনিয়র হাই স্কুলে মৌলভী পদে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা। পরবর্তীতে প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি শিকারপুর, রামপুর, উনঝুটি, খয়রাবাদ ও হোসেনতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। ১৯৯২ সালে অবসর নিলেও শিক্ষা ও সমাজচিন্তার আলো ছড়িয়ে গেছেন আমৃত্যু।
দেবীদ্বারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন এক নির্ভযোগ্য তথ্যভান্ডার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পাক-ভারত যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা স্মৃতি ও তথ্য তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এলাকায় সংগঠক হিসেবেও ভূমিকা রাখেন।
পাঁচ পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক আব্দুস সাত্তার মাস্টার অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন। তাঁর কঠোর শাসন ও স্নেহময় শিক্ষা আজও তাঁদের স্মৃতিতে অম্লান।
প্রয়াণের সাত বছর পরও তিনি দেবীদ্বারের মানুষের হৃদয়ে ইতিহাসের এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়- অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সততা ও অধ্যবসায় মানুষকে সত্যিকার অর্থে মহৎ করে তোলে। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।