কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় বৃদ্ধ বাবাকে ভরণপোষণ না দেওয়া, মারধর ও গালমন্দের অভিযোগ উঠেছে ছেলের বিরুদ্ধে।এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাবা মন্তাজ উদ্দিন (৬০) নিজ ছেলে আক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে বরুড়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৩নং আদ্রা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মন্দুক দাশ বাড়ী এলাকায় বসবাসরত মন্তাজ উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে ছেলে আক্তার হোসেনের অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রায়ই তাকে শারীরিকভাবে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, গত ২২ মার্চ সকাল আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটে স্থানীয় ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন জাকির হোসেনের দোকানের সামনে আক্তার হোসেনসহ কয়েকজন মিলে তার ছোট ছেলে মামুন হোসেনকে মারধর করে। এ সময় মন্তাজ উদ্দিন বাধা দিতে গেলে তাকেও মারধরের চেষ্টা করা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হয়।
চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও ব্যর্থ হয়ে ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগকারী মন্তাজ উদ্দিন বলেন, আক্তার আমার বড় ছেলে, আর মামুন আমার ছোট ছেলে। প্রায় ৪৫ বছর রিকশা চালিয়ে কষ্ট করে দুই ছেলেকে লালন-পালন করেছি, মানুষ করেছি, শিক্ষিত করেছি। কিন্তু এখন বড় ছেলে আক্তার ও তার স্ত্রী আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। আমার বড় ছেলের সন্তান আমাকে “দাদা” বলে দৌড়ে এলে আমি কোলে নিতে পারি না। আক্তার ও তার স্ত্রী দ্রুত এসে তাকে নিয়ে যায়, এরপর ঘরের দরজা বন্ধ করে আমাকে ইচ্ছামতো মারধর করে। এতে আমার বুক ফেটে যায়।
তিনি আরও বলেন, আগে বড় ছেলে আমার ভরণপোষণ দিত, এখন দেয় না। উল্টো আমার জন্য তার মুখে গালিগালাজ। আমার হার্টে রিং বসানো, আমি অসুস্থ মানুষ। এখন ছোট ছেলে মামুনের জন্যই বেঁচে আছি। সে-ই আমার চিকিৎসার খরচ চালায়। গত রবিবার বড় ছেলে আক্তার কয়েকজন লোক নিয়ে আমাদের বাড়ির সামনে দোকানের ভেতর আমার ছোট ছেলেকে মারধর করে। দোকানদার ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সে রক্ষা পায়। দুলাল, ফারুক, পারভেজসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে আক্তার আমার ছোট ছেলেকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হামলার শিকার মামুন হোসেন বলেন, আমি সার্জিক্যাল আইটেমের ব্যবসা করি। অনেক আগে বড় ভাই আক্তারকে আমিই এই ব্যবসায় নিয়ে আসি। কিন্তু ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর থেকেই সে লোভে পড়ে আমার সঙ্গে প্রতারণা শুরু করে। ঘটনার দিন ঈদের দ্বিতীয় দিন আমি বাড়ির সামনে চায়ের দোকানে বসেছিলাম। এ সময় আমার চাচাতো ভাই ফারুক মোটরসাইকেল নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করি, আমি কি তাকে মারধর করেছি কিনা। কারণ বাড়িতে কথা উঠেছিল, আমি নাকি তাকে মেরেছি।
তিনি বলেন, এর আগে আমার ভাগিনা তানভীর আমার বাবার সঙ্গে বেয়াদবি করেছিল। আমি ছোট মামা হিসেবে তাকে শাসন করি। বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। ফারুক তখন আমাকে বলেন, আমি তাকে মারিনি। এরপর সে বাড়ি চলে যায়। কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বড় ভাই আক্তারের নেতৃত্বে কয়েকজন লোক নিয়ে এসে দোকানে আমাকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করে। স্থানীয়রা আমাকে উদ্ধার করে দোকানের ভেতরে ঢুকিয়ে শাটার নামিয়ে দেয়। শাটার না নামালে সেদিন আমাকে মেরে ফেলত।
মামুন আরও বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে আমাকে হয়রানি করছে। আমি বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় জমি কিনে বাড়ি করেছি। তাদের উদ্দেশ্য আমাকে হত্যা করে বাবা-মাকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং আমার ব্যবসা ও সম্পত্তি দখল করা।
সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ বলেন, তাদের চিৎকার শুনে আমি বাড়ি থেকে দৌড়ে এসে দেখি মন্তাজের বড় ছেলে, তার চাচা ও চাচাতো ভাইয়েরা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর ছোট ছেলে দোকানের ভেতরে ছিল। পরে জানতে পারি, তার ওপর হামলা হয়েছে।
অভিযোগ তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শুভ সুর বলেন, তাদের মধ্যে আগে থেকেই পারিবারিক বিরোধ ছিল। ঘটনার দিন বড় ভাই ছোট ভাইয়ের ওপর হামলা করে। পরে ছোট ভাই ও তাদের বাবা থানায় অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। জিডির ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হবে, এরপর আদালত পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।