প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ১৩, ২০২৬, ১২:১৭ পি.এম
দেবীদ্বার: ‘অটো নয়, বাবা চেয়েছিলেন তার ‘সন্তানকে’- ১২ দিন পর অর্ধগলিত লাশ হয়ে ফিরলেন আলাউদ্দিন

আয়শা রহমান প্রজ্ঞা, দেবীদ্বার, প্রতিনিধি।।
কুমিল্লার দেবীদ্বারে নিখোঁজের ১২ দিন পর অটোরিকশাচালক আলাউদ্দিন (৩৫)’এর সন্ধান মিলেছে। তবে সেই সন্ধান আর জীবনের নয়, অর্ধগলিত লাশ হয়ে ফিরেছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি। যে অন্ধ পিতা সন্তানের ফেরার আশায় চোখের জল ফেলে বলেছিলেন, ‘অটো নয়, আমি আমার ছেলেটাকে ফিরে পেতে চাই’- অবশেষে তিনি সন্তানকে ফিরে পেলেন ঠিকই, তবে নিথর দেহে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানা পুলিশ মুরাদনগর উপজেলার ৪নং পূর্বধৈর ইউনিয়নের খোশঘর গ্রামের গণকবর সংলগ্ন এবং দেবীদ্বার উপজেলার বড়শালঘর গ্রামের সীমান্তবর্তী একটি খাল থেকে কচুরিপানার ভেতর ভাসমান অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। পরে লাশটি নিখোঁজ অটোরিকশাচালক আলাউদ্দিনের বলে শনাক্ত করা হয়।
নিহত আলাউদ্দিন দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের মো. সুলতান আহমেদের ছেলে। গত ১ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের ভাষ্যমতে, ওইদিন সন্ধ্যায় আলাউদ্দিন ফুলতলী গ্রামের এক মেকারের কাছে অটোরিকশা মেরামত করাতে যান। কাজ শেষ না হওয়ায় রাত আনুমানিক ৮টার দিকে তিনি মেকারকে জানান, বাকি কাজ পরদিন করবেন এবং আপাতত যাত্রী নিয়ে ভাড়ায় বের হচ্ছেন। এরপর থেকেই অটোরিকশাসহ তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
পরদিন ২ জানুয়ারি আলাউদ্দিনের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার দেবীদ্বার থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পাশাপাশি সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও পরিবারের অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হলো না- শেষ হলো আলাউদ্দিনের জীবন।
বাঙ্গরা বাজার থানা পুলিশ লাশ উদ্ধারের পর দেবীদ্বার থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করে। পরে পরিবারের সদস্যরা বাঙ্গরা বাজার থানায় গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ময়নাতদন্তের জন্য লাশ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
আলাউদ্দিনের মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে তার গোটা পরিবার। অন্ধ পিতা, অসুস্থ মা, স্ত্রী ও তিনটি শিশু সন্তান, আজ সবাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
নিহতের পিতা সুলতান আহমেদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি একজন অচল মানুষ। এক চোখ অন্ধ, কাজ করার শক্তি নেই। আমার দুই ছেলের একজন প্রবাসে, তারও কোনো খোঁজ নেই। এই সংসারের সবাই- আমি, আমার স্ত্রী, পুত্রবধূ, দুই নাতি আর এক নাতনীর ভরণ-পোষণ আলাউদ্দিনই চালাত। আমার পরিবারটা আজ অন্ধকারে ডুবে গেল। কী করবো, কোনো কুলকিনারা পাচ্ছি না।’
নিহতের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার বলেন, ‘আমি তিনটা ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় দাঁড়াব? ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমার অন্ধ শ্বশুর, অসুস্থ শাশুড়িসহ এই পরিবারটার কী হবে? থানায় জিডি করেছি, কিন্তু পুলিশের তৎপরতা তেমন দেখিনি। শুধু বলেছে- আপনারা খোঁজ নেন, আমরা কাজ করছি।’
এ বিষয়ে বাঙ্গরা বাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মান্নান জানান, ‘খালের কচুরিপানার ভেতরে ভাসমান অবস্থায় একটি অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা এসে লাশটি আলাউদ্দিনের বলে শনাক্ত করেন। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য কুমেক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।’
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘নিখোঁজ আলাউদ্দিনকে উদ্ধারে পুলিশ তৎপর ছিল। মোবাইল ট্র্যাকিংয়ে একপর্যায়ে লোকেশন পাওয়া গেলেও পরে ফোন বন্ধ থাকায় সঠিক অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। লাশ উদ্ধারের পর পরিবার শনাক্ত করেছে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, ‘নিখোঁজ হয়নি শুধু একটি অটো নয়, নিখোঁজ হয়ে গেল একটি পরিবারের পুরো জীবন।’
আয়শা রহমান প্রজ্ঞা, ০১৭৬১৭৪০২২৭, ১৩/০১/ ২০২৬ইং।
ছবির ক্যাপশন: দেবীদ্বারে নিখোঁজ অটোরিকশাচালক আলাউদ্দিন, আলাউদ্দিনের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার ও মা ছোটনা বেগম, সঙ্গে তিন শিশু সন্তান’র বুকভরা ছবিতে এখনও খুঁজছেন স্বজনকে, যিনি আর কোনোদিন ফিরবেন না।
Copyright © 2026 Dainik Cumilla. All rights reserved. | Developed by UNIK BD